সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ধারা ৫৯ ও বিধি ১৫০(১) অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবার ও আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা BRTA ট্রাস্টি বোর্ড থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। এই পেজে ফরম ৩২ পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ১১টি কাগজপত্রের সম্পূর্ণ তালিকা, নমুনা ফরম PDF, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও আবেদন বাতিলের কারণ — সবকিছু একসাথে।
সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক সহায়তা কারা পাবেন?
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী মোটরযান দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশ, স্থায়ীভাবে অক্ষম ব্যক্তি, এবং গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা BRTA ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য। চিকিৎসা ব্যয়ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দাবি করা যায়।
সাধারণ পরিবার যেন কাগজপত্রের জটিলতায় আটকে না যান — সেই উদ্দেশ্যে এই পেজ তৈরি করা হয়েছে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ পরিমাণ। চূড়ান্ত পরিমাণ ট্রাস্টি বোর্ড পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্ধারণ করে।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশ সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।
গুরুতর আঘাত বা স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়া যায়।
তুলনামূলক কম গুরুতর আঘাত বা চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়।
দ্রষ্টব্যঃ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের পরিস্থিতি, প্রদত্ত প্রমাণ ও কাগজপত্রের ভিত্তিতে ট্রাস্টি বোর্ড চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে। আবেদনের ২ মাসের মধ্যে অর্থ পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের কথা।
আবেদন করা থেকে শুরু করে অর্থ পাওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ যাত্রা।
হাসপাতাল, থানা, ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রয়োজনীয় সকল সনদ সংগ্রহ করুন। সাধারণত ৭-১৫ দিন লাগে।
ফরম নং-৩২ পূরণ করুন। নিচে নমুনা PDF দেওয়া আছে — দেখে দেখে পূরণ করতে পারবেন।
হলফনামা ও অঙ্গীকারনামা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সত্যায়িত করিয়ে নিন। ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে।
সকল কাগজসহ ফরম BRTA-র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে (বনানী, ঢাকা) অথবা জেলা BRTA সার্কেল অফিসে জমা দিন।
সবগুলো কাগজের ২-৩ সেট ফটোকপি রাখবেন। মূল কপি সাথে রাখবেন প্রমাণের জন্য।
Application Form (Form No. 32)
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়ে নির্ধারিত ফরমে আবেদন। ধারা ৫৯ ও বিধি ১৫০(১) অনুযায়ী।
Medical Certificate of Cause of Death
হাসপাতাল কর্তৃক ইস্যুকৃত মৃত্যুর কারণ বর্ণনা সংক্রান্ত মেডিকেল সার্টিফিকেট। মৃত্যুর কারণ "Road Traffic Accident (RTA)" হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
Death Registration Certificate
ইউনিয়ন পরিষদ / সিটি কর্পোরেশন থেকে ইস্যুকৃত মৃত্যু নিবন্ধন সনদ — যেখানে মৃত্যুর কারণ "ROAD TRAFFIC ACCIDENT (RTA)" উল্লেখ থাকবে। সাধারণত ৩-৭ কর্মদিবস লাগে।
Inheritance / Heir Certificate
নিজ ইউনিয়ন পরিষদ / পৌরসভা থেকে ইস্যুকৃত ওয়ারিশ সনদ — যেখানে মৃত ব্যক্তির সকল উত্তরাধিকারীর নাম, NID/জন্ম নিবন্ধন ও সম্পর্ক উল্লেখ থাকবে। ফি ১০০-৫০০ টাকা।
Death Certificate (Union Parishad)
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যু সংক্রান্ত সনদপত্র — যাতে মৃত্যুর তারিখ, স্থান ও কারণ উল্লেখ থাকে।
Birth Registration Certificate
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে — নাবালক সন্তান বা নির্ভরশীল ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধন সনদ। মৃতের সন্তানদের পরিচয় প্রমাণের জন্য বাধ্যতামূলক।
National ID Card Copy
আবেদনকারী এবং মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের পরিষ্কার ফটোকপি। উভয় পাশ স্ক্যান/ফটোকপি করতে হবে।
Notarized Affidavit / Undertaking
১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে — আবেদনকারীর পরিচয়, মৃতের সাথে সম্পর্ক, ওয়ারিশের তথ্য এবং তথ্যের সত্যতার ঘোষণা। নোটারি পাবলিক/আইনজীবী কর্তৃক সত্যায়িত।
Compensation Claim Documents
থানার FIR/GD কপি, দুর্ঘটনার ছবি, পত্রিকার কাটিং (থাকলে), এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ববর্তী কোনো দাবির কাগজ থাকলে যুক্ত করতে হবে।
Photos & Signatures of Applicant & Heirs
পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি, পরিষ্কার স্বাক্ষর বা টিপসই — প্রতিটি ওয়ারিশের জন্য আলাদাভাবে। ছবি স্ট্যাম্পে আঠা দিয়ে লাগানো থাকবে।
Lawyer's Notary Seal & Signature
নোটারি পাবলিক / সনদপ্রাপ্ত আইনজীবীর সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত পৃষ্ঠা। ক্ষমতাপত্র, হলফনামা ইত্যাদিতে নোটারি সিল বাধ্যতামূলক।
একটি ভরাট-করা নমুনা ফরম PDF আকারে — কোথায় কী লিখতে হবে দেখার জন্য। সব তথ্য কাল্পনিক।
এই ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন — অনেক পরিবার শুধু এসব কারণে ক্ষতিপূরণ পায়নি।
সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া — দুর্ঘটনার ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন না করলে। এই সময়সীমা আগে ৩০ দিন ছিল, এখন বাড়িয়ে ৬০ দিন করা হয়েছে।
মৃত্যুর কারণ ভুল লেখা — মেডিকেল সার্টিফিকেট ও মৃত্যু সনদে "Road Traffic Accident (RTA)" না থাকলে। শুধু "Cardiac Arrest" বা "Natural Cause" লেখা থাকলে বাতিল।
ওয়ারিশ সনদে গরমিল — ওয়ারিশের নাম, NID নম্বর বা সম্পর্কে ভুল থাকলে। প্রতিটি ওয়ারিশের নাম যেন NID-র সাথে অক্ষরে অক্ষরে মিলে।
নোটারি ছাড়া হলফনামা — ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে হলফনামা থাকলেও নোটারি পাবলিকের সিল না থাকলে। নোটারি সিল ও তারিখ দুটোই বাধ্যতামূলক।
FIR/GD ছাড়া আবেদন — থানায় দুর্ঘটনার সাধারণ ডায়েরি (GD) বা মামলা (FIR) না হলে। দুর্ঘটনার পরই থানায় অভিযোগ করা বাধ্যতামূলক।
অসম্পূর্ণ কাগজপত্র — ১১টি কাগজের যেকোনো একটি বাদ পড়লে বা ফটোকপি অস্পষ্ট হলে। জমা দেওয়ার আগে চেকলিস্ট মিলিয়ে নিন।
স্বাক্ষর/টিপসই সমস্যা — ফরমে আবেদনকারীর স্বাক্ষর বা টিপসই অপরিষ্কার থাকলে, কিংবা ওয়ারিশদের ছবি/স্বাক্ষর না থাকলে।
ঢাকা প্রধান অফিস ছাড়াও জেলা পর্যায়ের BRTA সার্কেল অফিসেও আবেদন গ্রহণ করা হয়।
দুর্ঘটনাটি যে থানার এলাকায় ঘটেছে — সেই থানার নাম লিখুন। কোন BRTA মেট্রো সার্কেলে আবেদন করতে হবে তা সাথে সাথেই জানতে পারবেন। (BRTA-র ০৬.০৭.২০২২ তারিখের সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী)
ঢাকা মেট্রো এলাকার ৫০টি থানা এখানে অন্তর্ভুক্ত। অন্য জেলার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার BRTA সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করুন।
উৎসঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA), সংশোধিত প্রজ্ঞাপন স্মারক নং-৩৫.০৩.০০০০.০০১.৩৪.০২০.২২-১১৯১, তারিখ ০৬.০৭.২০২২। মূল প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত সচিব ও চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার স্বাক্ষরিত।
BRTA ভবন, বনানী, ঢাকা-১২১২ — পরিচালক (অডিট ও আইন) বরাবর জমা দিতে হয়। জেলা পর্যায়ে BRTA সার্কেল অফিসেও আবেদন গ্রহণ করা হয়।
মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত, গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত, এবং সাধারণ আঘাতের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়। সঠিক পরিমাণ ট্রাস্টি বোর্ড নির্ধারণ করে।
দুর্ঘটনার ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন জমা দিতে হবে। পূর্বে এই সময়সীমা ছিল ৩০ দিন, যা ২০২৫ সালে বাড়িয়ে ৬০ দিন করা হয়েছে। সময়সীমা পেরিয়ে গেলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
আইন অনুযায়ী আবেদনের দুই মাসের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের কথা। তবে প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কয়েক মাস বেশি লাগতে পারে। নিয়মিত BRTA-তে যোগাযোগ রাখুন।
আইনজীবী থাকা বাধ্যতামূলক নয়, তবে হলফনামা ও অঙ্গীকারনামার জন্য নোটারি পাবলিক/আইনজীবীর সিল লাগবে। কাগজপত্র জটিল হওয়ায় একজন আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
নাবালক সন্তানের ক্ষেত্রে মা/অভিভাবক হলফনামার মাধ্যমে তার পক্ষে আবেদন করেন। সন্তানের জন্ম নিবন্ধন সনদ ও সম্পর্ক প্রমাণের কাগজ যুক্ত করতে হয়।
BRTA-র ০৬.০৭.২০২২ তারিখের সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ঢাকা মেট্রো এলাকার ৫০টি থানা ৪টি সার্কেলে বিভক্ত। সার্কেল-১ এ ১৬টি (রমনা, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর সহ), সার্কেল-২ এ ১৫টি (লালবাগ, কোতোয়ালী, যাত্রাবাড়ী সহ), সার্কেল-৩ এ ৯টি (তুরাগ, উত্তরা, বিমানবন্দর সহ), এবং সার্কেল-৪ এ ১০টি (গুলশান, বনানী, রামপুরা সহ)। উপরে "BRTA Circle Finder" সেকশনে থানার নাম লিখে খুঁজে নিতে পারেন।
সাধারণত যেসব কারণে আবেদন বাতিল হয়: ৬০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া, মৃত্যু সনদে দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ না থাকা, ওয়ারিশ সনদে ভুল তথ্য, NID-র সাথে নাম না মেলা, এবং নোটারি ছাড়া হলফনামা। উপরে "কেন আবেদন বাতিল হয়" সেকশনে বিস্তারিত আছে।
দ্রষ্টব্যঃ এই পেজের তথ্য সাধারণ গাইডলাইন হিসেবে দেওয়া হয়েছে এবং কোনো আইনি পরামর্শ নয়। সর্বশেষ নিয়মকানুনের জন্য BRTA-র সরকারি ওয়েবসাইট (brta.gov.bd) দেখুন অথবা সরাসরি BRTA অফিসে যোগাযোগ করুন। যেকোনো জটিল ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।